মোবাইল কোর্ট হলো বাংলাদেশ সরকার প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার বাইরেও আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ প্রতিরোধকে আরো গতিশীল করতে একধরণের কোর্ট ব্যবস্থা যা মোবাইল কোর্ট নামে পরিচিত। মোবাইল কোর্টের মূল কাজ হচ্ছে অপরাধের ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধ আমলে নিয়ে শাস্তি প্রদান করা। মোবাইল কোর্টের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিস্তারিতভাবে মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯ এ উল্লেখ আছে।
মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯ এর ধারা ৫ অনুযায়ী সরকার সারাদেশ অথবা যেকোন একটি নির্দিষ্ট জেলা বা মেট্রোপলিটন এলাকায় যেকোন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটকে এবং ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট তার আঞ্চলিক এখতিয়ারের অধীন যেকোন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটকে লিখিত আদেশ দ্বারা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার ক্ষমতা প্রদান করতে পারেন।
সুতরাং, এই ধারা পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ সচরাচর মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার ক্ষমতা রাখেন।
বাংলাদেশ ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী দেশে দুই ধরণের ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছে। জুডিসিয়াল বা বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট ও এক্সিকিউটিভ বা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকেও ফৌজদারি আদালত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১০ ধারায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ ও কার্যাবলি সম্পর্কে কিছু ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী সরকার প্রত্যেক জেলায় ও মেট্রোপলিটন এলাকায় যে সংখ্যক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজন মনে করবেন তা নিয়োগ দিতে পারেন।
১০ ধারার ৫ উপধারায় বলা হয়েছে সরকার যদি প্রয়োজন মনে করেন তবে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন) এ নিয়োজিত যে কোন ব্যাক্তিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন এবং উক্ত যেকোন সদস্যকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা অর্পণ করতে পারেন।
একই ধারার ৬ উপধারায় বলা হয়েছে উপধারা ৪ এর অধীনে স্থানীয় সীমা চিহ্নিতকরণ সাপেক্ষে কোন জেলায় বা উপজেলায় সহকারী কমিশনার, অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার বা উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে নিযুক্ত ব্যক্তি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে গণ্য হবে। তাছাড়া তাদের স্থানীয় সীমার মধ্যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা প্রয়োগ করবে।
ফৌজদারী কার্যবিধির ধারা ১২ অনুযায়ী সরকার চাইলে নির্দিষ্ট কোন সময়কালের জন্য যে কাউকে বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সকল বা আংশিক কোন ক্ষমতা অর্পন করতে পারে। যদিও এখানে কিছু শর্ত আছে। শুধুমাত্র এখানেই শেষ নয়, এরকম বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেটকে সরকার চাইলে হাইকোর্ট বিভাগের সাথে পরামর্শক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সকল বা আংশিক ক্ষমতা অর্পণ করতে পারে।
নিশ্চয় এখন বুঝতে পারা যাচ্ছে যে সচরাচর কে বা কারা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা পেতে পারে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১২ ধারায় এক প্রকারের বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেট এর কথা বলা হয়েছে।
মোবাইল কোর্ট আইনের ধারা ৬ অনুযায়ী মোবাইল কোর্টের বেশ কিছু অপরাধের বিচার করারি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, এই আইনের ধারা ৫ ও ১১ এর অধীন ক্ষমতাপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ও ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট তফসিলে বর্ণিত আইনের অধীন কোন অপরাধ যা কেবল জুডিসিয়াল ও মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বিচার্য তা ঘটনাস্থলে আমলে নিয়ে বিচার করতে পারেন।
একটু লক্ষ্য করুন, তফসিলে বর্ণিত অপরাধের কথা বলা হয়েছে। মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিলে দন্ডবিধি’র উনপঞ্চাশটি নির্দিষ্ট ধারার অপরাধ দেওয়া আছে। তাছাড়া এই মূল আইন ছাড়া বিশেষ ১১০(একশত দশটি) আইনের কথা উল্লেখ রয়েছে।
তার মানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে একজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট অনেক আইনের আলোকে তাৎক্ষণিক অপরাধ আমলে নিয়ে বিচার করতে পারে।
যদিও উক্ত আইনের তফসিলে বর্ণিত অনেক আইনের উল্লেখিত অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার মোবাইল কোর্টকে দেওয়া হয়েছে কিন্তু এই আইনের ধারা ৮ ও ৯ এর মাধ্যমে দন্ড ও জরিমানা আরোপে কিছু সীমাবদ্ধতা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
মোবাইল কোর্ট সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কারাদন্ড দিতে পারে এমনকি তফসিলবর্ণিত আইনে কোন অপরাধে এর বেশি দন্ড থাকলেও দুই বছরের বেশি কারাদন্ড মোবাইল কোর্ট দিতে পারেন না। মোবাইল কোর্ট জরিমানা আরোপ করবেন সংশ্লিষ্ট আইনে উল্লেখিত অর্থদন্ডের সীমার মধ্যে।
তাছাড়া কারাদন্ড ও জরিমানা ফৌজদারী কার্যবিধির নিয়ম অনুযায়ী হবে।
লিগ্যাল জুরিসপ্রুডেন্স ও সংবিধান মোতাবেক আইন সকলের জন্য সমান এবং এর কোন সীমানা নেই। আদালতের শ্রেণী অনুযায়ী নিম্ন আদালত থেকে বিচার শুরু হয়ে রায় হলে সে রায়ের আপিল করে সু-বিচার পাওয়ার সুযোগ আইনে আছে এবং এটা প্রাকৃতিক।
মোবাইল কোর্ট দ্বারা যদি কোন কারাদন্ড কিংবা অর্থদন্ড যদি আপনার কাছে বে-আইনি মনে হলে আপনি সে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন।
মোবাইল কোর্ট আইনের ১৩ ধারার (১) উপধারা অনুযায়ী এই আইনের অধীন আরোপিত কোন দন্ড দ্বারা যদি কোন ব্যক্তি সংক্ষুব্দ হয় তাহলে জেলা বা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট এর কাছে আপিল দায়ের করতে পারেন।
আবার আপিল দায়েরের পর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এর রায়ে সন্তুষ্ট না হলে বা এরূপ রায়ও বে-আইনি মনে হলে উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে আপনি দায়রা জজের কাছে আপিল দায়ের করতে পারেন।
ফৌজদারী কার্যবিধি’র ৪৩৫ ধারা অনুযায়ী নির্বাহী বা জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক প্রদত্ত কোন দন্ড বে-আইনি হলে এবং তা যদি হাইকোর্ট বিভাগ বা দায়রা জজের গোচরীভূত করা হয় তাহলে তাঁর অধিক্ষেত্রের অধীন উক্তরূপ রায়ের নথি তলব করে যেকোন প্রকার দন্ড স্থগিত বা আসামী আটক থাকলে তাকে জামিনে মুক্তি দিতে পারে। ৪৩৫ ধারার উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সকল ম্যাজিস্ট্রেট দায়রা জজের অধস্তন বলে গণ্য হয়।
এছাড়াও হাইকোর্ট বিভাগ ও দায়রা জজ ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৪৩৯ ও ৪৩৯(ক) অনুযায়ী, কোন মামলার নথি তলব করে থাকলে বা অন্য কোনভাবে উক্ত বিষয় গোচরীভূত হইলে হাইকোর্ট বিভাগ বা দায়রা জজ ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৪২৩, ৪২৬, ৪২৭ এবং ৪২৮ অনুযায়ী আপীল আদালতের এখতিয়ার প্রয়োগ করে কোনো আসামীর খালাস, দন্ড হ্রাস বা বৃদ্ধি করতে পারেন।
মোবাইল কোর্ট বা কোনো অধস্তন আদালত প্রদত্ত কোন বেআইনী বা অসাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির মৌলিক অধিকার (অনুচ্ছেদ ২৭ থেকে ৪৩, বাংলাদেশ সংবিধান) যার কোন একটি লঙ্গন হয়েছে মনে হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট এর হাইকোর্ট বিভাগে দন্ডাদেশ এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রিট পিটিশন দায়ের করিতে পারবেন।
পাঠক উপরের লেখার মাধ্যমে আপনাকে মোবাইল কোর্টের সংক্ষিপ্ত কিছু ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছি মাত্র যা আপনার জানা জরুরী, কোনভাবেই এই লেখায় মোবাইল কোর্ট সম্পর্কে সম্পূর্ণ বর্ণনা হয়নি। পরিশেষে বলতে চাই মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯ এর অধীন একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে একধরণের বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দুই বছরের কারাদন্ড দিতে পারে অনায়াসেই। সচরাচর বর্তমান সময়ে খবরের কাগজে মোবাইল কোর্টের ক্ষমতার অতিচর্চা সম্পর্কে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই লেখার মাধ্যমে নিশ্চয় আপনি মোাবাইল কোর্ট সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেয়েছেন।
কোন প্রকার ম্যাজিস্ট্রেটের রায়ে সংক্ষুব্ধ হলে অবশ্যই বিজ্ঞ একজন আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নিন। ধন্যবাদ।