দেওয়ানী মামলা বলতে বুঝায় সকল প্রকার সম্পত্তি বা পদের অধিকার সম্পর্কিত মামলা। দেওয়ানী মামলা সাধারণ স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি বা প্রার্থনার অধিকার সম্পর্কে আলোচনা করে।
একটি দেওয়ানী মামলা কিভাবে শুরু থেকে নিষ্পত্তি পর্যন্ত চলবে তার পদ্ধতি দেওয়া আছে দেওয়ানী কার্যবিধিতে। ১৯০৮ সালে প্রণয়ন করা হয় দেওয়ানী কার্যবিধি। দেওয়ানী কার্যবিধি একটি পদ্ধতিগত আইন বা Procedural Law.
দেওয়ানী আদালত আইন, ১৮৮৭ এর ধারা ৩ অনুযায়ী বাংলাদেশে ৫ প্রকারের দেওয়ানী আদালত আছে।
একটি জেলার সর্বোচ্চ দেওয়ানী আদালত হলো জেলা জজ আদালত। এরপর নিচ থেকে উপরের ক্রমানুসারে।
এরপরে দেশের সর্বোচ্চ আদালত হলো বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট। সুপ্রীম কোর্টের দুইটি বিভাগ। আপীল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ।
দেওয়ানী আদালতের এখতিয়ারকে আবার ৫ ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
আমরা উপরের আলোচনায় দেখেছি দেওয়ানী আদালতের ভিন্ন ভিন্ন ৫ প্রকারের এখতিয়ার আছে। আপনি প্রথমে যখন একটি দেওয়ানী মামলা দায়ের করতে যাবেন তখন কোন দেওয়ানী আদালতে করবেন তা জানতে হলে আপনাকে এই এখতিয়ার বুঝতে হবে।
বিষয়বস্তুগত এখতিয়ার বলতে বুঝায় দেওয়ানী আদালতের বিচারের বিষয় সম্পর্কিত। কোন প্রকার ফৌজদারী বিষয় সম্পর্কিত মামলা দেওয়ানী আদালত বিচার করবে না। সুতরাং আপনার দেওয়ানী মামলার বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে যখন আপনি দেওয়ানী মামলা দায়ের করতে যাবেন।
আঞ্চলিক এখতিয়ার দেওয়ানী মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে খুবই জরুরী একটি বিষয়। আপনার দেওয়ানী মামলার বিষয়বস্তু কোথায় অবস্থিত বা কোথায় মামলার উদ্ভব হয়েছে সে আঞ্চলিক এখতিয়ার সম্পন্ন দেওয়ানী আদালতে মামলা করতে হবে।
(উদাহরণ: আপনার জমি নিয়ে বিরোধ হলো। ধরুন বিরোধীয় জমিটি টাঙ্গাইল জেলাতেই অবস্থিত। সুতরাং আপনাকে সে জমির বিষয়ে মামলা করতে হলে টাঙ্গাইল জেলার দেওয়ানী আদালতে মামলা করতে হবে। আপনি চাইলেও এই মামলা ঢাকা জেলার দেওয়ানী আদালতে করতে পারবেন না। এটাই দেওয়ানী আদালতের আঞ্চলিক এখতিয়ার।)
আর্থিক এখতিয়ার হলো কোন দেওয়ানী আদালত কত মূল্যমানের দেওয়ানী মামলা বিচার করতে পারবে সে এখতিয়ার। দেওয়ানী আদালত (সংশোধন) আইন, ২০২১ অনুযায়ী সহকারী জজ আদালত সর্বনিম্ন ১ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৫ লক্ষ টাকা মূল্যমানের মামলার বিচার করতে পারবেন।
সিনিয়র সহকারী জজ আদালত সর্বনিম্ন ১৫ লক্ষ ১ টাকা থেকে ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত মূল্যমান মামলার বিচার করতে পারবে।
যুগ্ন জেলা জজ আদালত ২৫ লক্ষ এক টাকা থেকে অসীম মূল্যমানের দেওয়ানী মামলার বিচার করতে পারে। এই তিন আদালত সরাসরি মামলার মূল্যমান অনুযায়ী মামলার বিচার করে থাকে।
আদি বা মূল এখতিয়ার হলো দেওয়ানী মামলার মূ্ল্যমান অনুযায়ী নির্দিষ্ট আদালতে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া। দেওয়ানী কার্যবিধির ধারা ১৫ অনুযায়ী প্রত্যেক দেওয়ানী মামলা সর্বনিম্ন দেওয়ানী আদালতে দায়ের করতে হয়।
উপরের আলোচনা অনুযায়ী মামলার মূল্যমান হিসেব করে আর্থিক এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে মামলা দায়েরকেই আদি বা মূল এখতিয়ার বুঝায়।
জেলা ও অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতের আদি বা মূল এখতিয়ার নেই। মানে কোন দেওয়ানী মামলা সরাসরি এই দুই আদালতে করা যাবে না। তবে কিছু কিছু ব্যতিক্রম দেওয়ানী মামলায় সরাসরি এই দুই আদালতের আদি এখতিয়ার আছে।
আপিল এখতিয়ার হলো আদি বা মূল এখতিয়ার সম্পন্ন আদালতের দেওয়া রায়, আদেশ বা ডিগ্রির বিরুদ্ধে সংক্ষুব্দ হয়ে কোন আদালতে আপিল করতে হবে সে এখতিয়ার।
সহকারী জজ, সিনিয়র সহকারী জজ ও যুগ্ন জেলা জজ আদালতের দেওয়া রায় বা ডিগ্রির বিরুদ্ধে আপিল করতে হবে জেলা জজ আদালতে। এক টাকা থেকে ৫ কোটি টাকা মূল্যমানের আপিল জেলা জজ আদালতে।
এখানে যেহেতু যুগ্ন জেলা জজ আদালতে ২৫ লক্ষ টাকা থেকে অসীম মূল্যমানের মামলার বিচার করার আদি বা মূল এখতিয়ার আছে সেহেতু এই আদালত থেকে পাঁচ কোটি টাকার বেশী মূল্যমানের মামলার আপিল করতে হবে হাইকোর্ট বিভাগে। কারণ পাঁচকোটি টাকার বেশি মূল্যমানের আপিল এখতিয়ার আছে হাইকোর্ট বিভাগের।
অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতের কোন আদি এখতিয়ার কিংবা আপিল এখতিয়ার নেই। তিনি কেবল জেলা জজ কর্তৃক প্রদত্ত আপিল মামলার আপিল বিচার করতে পারেন।
দেওয়ানী কার্যবিধির ২৬ ধারায় বলা হয়েছে প্রত্যেক দেওয়ানী মামলা আরজি উপস্থাপনের মাধ্যমে দায়ের করতে হবে।
তাছাড়া দেওয়ানী কার্যবিধির ৪ আদেশের ১ নং বিধিতে উল্লেখ আছে, দেওয়ানী আদালতে আরজি উপস্থানের মাধ্যমে প্রত্যেক দেওয়ানী মামলা দায়ের করতে হবে।
পাশাপাশি আরজির অবিকল নকল কপি বিবাদীর নিকট পরোয়ানা জারির জন্য পেশ করার কথাও এখানে বলা হয়েছে।
আরজির মাধ্যমে দেওয়ানী মামলা দায়েরের সময় বিবাদীর উপর পরোয়ানা জারি করার জন্য নির্ধারিত কোর্ট ফিস দিতে হবে এবং তা ১ নং বিধির (১ক) উপ-বিধিতে বলা আছে।
তাছাড়া আরজি দায়েরের ক্ষেত্রে ৬ষ্ট ও ৭ আদেশের বিধিতে খুঁটিনাটি বিষয়েও আলোচনা করা হয়েছে।
আরজি মাধ্যমে দেওয়ানী মামলা দায়ের করার পর বাদীর প্রধান কাজ হচ্ছে বিবাদীর উপর সমন জারি করা। দেওয়ানী কার্যবিধির ২৭ ধারায় বিবাদীকে সমন দেওয়ার কথা উল্লেখ আছে।
সমন কিভাবে দিতে হবে এবং বিবাদীর উপর সমন জারির নিয়ম বিস্তারিত বলা আছে আদেশ ৫ এর বিভিন্ন বিধিতে।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী মামলা করার পাঁচ দিনের মধ্যে আদালত বিবাদীর বিরুদ্ধে সমন জারি করে থাকেন। সমন জারির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বিবাদীকে মামলা সম্পর্কে অবহিত করে বাদীর আরজির উত্তর প্রদান করা।
দেওয়ানী মামলার তৃতীয় ধাপে আছে লিখিত জবাব বা বর্ণনা বা আপত্তি দাখিল। বিবাদী সমন পাওয়ার পর অথভা স্ব-জ্ঞাত হলে তিনি আদালতে আরজির জবাব দিয়ে আদালতে যথাযথভাবে লিখিত জবাব দিবেন।
৮ আদেশে লিখিত জবাব কিভাবে দিতে হবে তার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া আছে। যেমন লিখিত বিবৃতিতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বিবাদী ত্রিশ কার্যদিনের মধ্যে লিখিত জবাব দেওয়ার বিধান আছে। আবার ক্ষেত্রবিশেষে সময় বাড়ানোও যায়।
সর্বোচ্চ ষাট দিনের মধ্যে বিবাদীকে লিখিত জবাব দাখিল করতে হয়। লিখিত জবাবে বিবাদী মামলাটি খারিজের, বাতিলের সমর্থনে হেতু উত্থাপন করবেন। এবং সুনির্দিষ্টভাবে অস্বীকার করতে হবে।
বাদী-বিবাদীর আরজি ও লিখিত জবাব আদালত গ্রহণ করার পর আদালত যদি চায় সেক্ষেত্রে মামলাটি মধ্যস্থতা করার জন্য পাঠাতে পারেন অথবা শুনানী বন্ধ রেখে আদালত নিজেই মামলাটি মধ্যস্থতা করতে পারেন।
পাশাপাশি লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা, উভয় পক্ষের নিয়োজিত আইনজীবী অথবা পক্ষগণের মতামতের ভিত্তিতে আদালত যেখানে উপযুক্ত মনে করেন সেখানে মামলাটি মধ্যস্থতা করতে পাঠাতে পারেন।
দেওয়ানী কার্যবিধির ৮৯(এ),(বি),(সি) ধারাতে মধ্যস্থতা, সালিস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। যদি মধ্যস্থতায় মামলা নিষ্পত্তি হয়ে যায় সেক্ষেত্রে আদালত সে ভিত্তিতে ডিগ্রি বা রায় ঘোষণা করবেন।
মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক নয়। পক্ষগণ মধ্যস্থতা না চাইলে আদালত মামলার বিচার্য বিষয় নির্ধারণ করবেন যাকে আমরা ইস্যু গঠন বলে জানি। দেওয়ানী কার্যবিধির ১৪ আদেশে ইস্যু গঠন নিয়ে বলা আছে।
ইস্যু গঠন মামলার চতুর্থ ধাপ। মামলায় সুনির্দিষ্ট কি বিষয়ে বিচার করা হবে তা ইস্যু গঠনের মধ্য দিয়ে নির্ধারণ করা হয়।
দেওয়ানী মামলার এ পর্যায়ে আদালত যেকোন সময় স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে অথবা কোন পক্ষের আবেদনক্রমে মামলার বিষয়ে প্রশ্নাবলী প্রদান ও জবাবদান, দলিল ও তথ্যাবলীর স্বীকৃতি এবং উদঘাটন, পরিদর্শন, দাখিল, দলিল অন্তরীণ বা প্রত্যর্পণ অথবা সাক্ষ্য হিসাবে দাখিলযোগ্য অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী সম্পর্কিত সকল বিষয়ে প্রয়োজনীয় ও যুক্তিপূর্ণ হতে পারে এরূপ আদেশ দিতে পারেন।
তাছাড়া সাক্ষ্যদান অথবা দলিল দাখিল অথবা উপরোক্ত অন্য উদ্দেশ্যে যাদের হাজির হওয়ার প্রয়োজন, তাদের প্রতি সমন প্রেরণ করতে পারেন।
চূড়ান্ত শুনানীর আগে আদালত উভয় পক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য শুনবেন এবং চূড়ান্ত শুনানীর জন্য একটি দিন নির্ধারণ করেন। চূড়ান্ত শুনানী বা Peremptory Hearing এ আদালত মামলার বিষয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু করেন।
দেওয়ানী মামলার এই স্টেইজে আদালত সাক্ষ্য গ্রহণ অবিরত রাখবেন। একদিনে সাক্ষ্য গ্রহণ সমাপ্ত করা না গেলে পুনরায় সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন নির্ধারণ করবেন।
সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হলে আদালত এ পর্যায়ে পুনরায় শুনানী বা Further Hearing করবেন। শুনানী শেষে আদালত যুক্তিতর্কের জন্য একটি দিন নির্ধারণ করবেন।
দেওয়ানী মামলায় একদম শেষ পর্যায়ে আছে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন। মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ও অধিকতর শুনানী শেষে উভয়পক্ষের আইনজীবীরা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবেন।
যুক্তিতর্ক সমাপ্ত হওয়ার পর আদালত রায়ের জন্য দিন নির্ধারণ করবেন। দেওয়ানী কার্যবিধির ৩৩ ধারায় বলা হয়েছে মামলার শুনানী শেষে আদালত রায় ঘোষণা করবেন এবং রায়ের ভিত্তিতে ডিক্রি প্রদান করবেন।
রায় এবং ডিক্রি কিভাবে এবং কখন প্রদান করবেন সে বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে দেওয়ানী কার্যবিধির আদেশ ২০ এর বিভিন্ন বিধিতে। ডিক্রি প্রদানের পরেই একটি দেওয়ানী মামলা শেষ হয়।
একটা প্রবাদ আছে “Justice Delayed, Justice Denied” যার বাংলা দেরীতে বিচার পেলেও সে বিচার অর্থহীন। আপনারা যারা দেওয়ানী মামলা সম্পর্কে অবগত আছেন বা নিজেদের মামলা আছে তারা জানেন একটি দেওয়ানী মামলা ১০ থেকে ২০ বছর সময় অব্দি শেষ হয়।
দেওয়ানী মামলা নিষ্পত্তিতে সময় লাগার প্রধান এবং অন্যতম কারণ হচ্ছে মামলার পক্ষগণের সচেতনতার অভাব ও সঠিক তদবিরের অভাব। অনেক সময় একপক্ষ অন্যপক্ষকে হয়রানীর জন্য মামলা করার পরে বারবার আদালতে সময়ের আবেদন করে থাকেন যার কারণে মামলা নিষ্পত্তি অধিক সময় প্রয়োজন হয়।
তাছাড়া বাংলাদেশে যে পরিমাণ দেওয়ানী মামলা সে পরিমাণে বিচারক বা বিচারালয় নেই। যার কারণে একেকটি দেওয়ানী মামলা শুনানীর তারিখ কয়েকমাস পরে হয়।
মামলার পক্ষগণ অনেকসময় একটি দেওয়ানী মামলায় বিভিন্ন আদেশের বিরুদ্ধে আপীল, রিভিসন করে থাকেন যার কারণে মূল মামলা থেমে থাকে। এসব কারণে মূলত একটি দেওয়ানী মামলা নিষ্পত্তিতে বহুবছর সময় লেগে যায়।
আমরা কখনো সরাসরি দেওয়ানী মামলা দায়েরে উৎসাহিত করি না। প্রথমেই কোন বিষয়বস্তু নিয়ে যদি মামলার উদ্ভব হয় বা ঝামেলা দেখা দেয় তাহলে প্রথমেই উচিৎ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সেটি সমাধান করার চেষ্টা করা।
এরপরেও যদি দেখা যায় যে সমাধান হচ্ছে না তাহলে কয়েকজন দেওয়ানী প্র্যাক্টিস করেন এমন আইনজীবী সমন্বয়ে প্যানেল তৈরি করে সমাধানের চেষ্টা করা।
যদি এক্ষেত্রে সমাধান না হয় বা জটিলতা দেখা দেয় তাহলে দেওয়ানী আদালতে মামলা দায়ের করা যেতে পারে। মধ্যস্থতার মাধ্যমে যদি দেওয়ানী কোন বিষয় সমাধান হয়ে যায় তাহলে উভয় পক্ষের লাভ। দেওয়ানী আদালতে মামলা হলে পক্ষ-বিপক্ষ উভয়ের আর্থিক, কায়িক ও মানসিক ক্ষতি।
সুতরাং দেওয়ানী কোন মামলা করার আগে অবশ্যই অবশ্যই সামাজিকভাবে তা সমাধানের চেষ্টা করুন।